সাধুসংঘ

'সাধুসংঘ' গল্পগ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য হইলো- এই বইয়ের সকল গল্পই সাধুভাষায় রচিত। বাংলা ব্যাকরণে সাধুভাষার মৌলিক যে প্রকৃতি তাহার পরিপূর্ণ অবয়ব উন্মোচন করিবার জন্য সামান্য এই প্রয়াস হয়তো সুপ্রিয় পাঠককূলকেও আন্দোলিত করিবে। স্কুল জীবনের চৌহদ্দি অতিক্রমের পর হইতে ইহা প্রায় অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য যে, সাধুভাষার ব্যবহার এখন শুধুমাত্র ব্যাকরণ শিক্ষা আর ভূতপূর্ব বইপত্রেই শোভা পাইতেছে। এক সময়ের লেখালেখি প্রক্রিয়ার প্রবল শক্তিশালী মাধ্যম সাধু ভাষা আজ যেনোবা কালের বাস্তবতায় ইতিহাসে ঠাঁই নিতে চলিয়াছে। জীবিত লেখক সমাজ কী তাহলে সাধু ভাষা হইতে নিজেদের বন্ধন ছিন্ন করিবার ষড়যন্ত্রে নামিয়াছেন? কিন্তু সাধু ভাষা না জানিয়া সাধু সাজিবার অভিপ্রায় লালন করিবার মধ্যে ভণ্ডামীর ষোলোকলা লুক্কায়িত থাকিলেও, আর যাহা হউক উহাতে যে কোনোই মহত্ব নাই তাহা হলোপ করিয়াই বলিতে পারি। পাশাপাশি যাহারা সাধু ভাষার শত্রু হইবার জন্য মনে মনে দীক্ষা লইয়াছেন, তাহাদের জন্য মুণ্ডুপাত হইবার মতো দণ্ড প্রয়োগের অভিশাপ রইলো। পণ্ডিতগণ ভুলিয়া জাইবেন না একদিন এই সাধু ভাষাই আপনার শিকড়ের কথাকেই সকলকে স্মরণ করাইয়া দিবে। আর হয়তো ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসিবে যখন আপনারা ভাষার ন্যাংটি ছাড়িয়া কোর্তা না পড়িবার জন্য আবারো মাথা ঠুকাইয়া তখন হায় হায় করিবেন। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ যে কতোটা অমার্যনীয় অপরাধ তাহা যাহারা ভাষার শুদ্ধতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নহে তাহারা পুনর্জন্মেও উপলব্ধি করিতে পারিবেন না বলিয়া বিশ্বাস করি।

আজকাল সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে সাহিত্য সাময়িকীর ছদ্মবেশে সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় সাহিত্যের নামে যাহা কিছু ছাপা হইতেছে তাহার ভাষা শুদ্ধতার দিকে কাহারো নজর পড়িলে একটু খুটাইয়া দেখিবেন, কীভাবে আমাদের সুন্দর ভাষাকে কতিপয় তুঘলকি সাহিত্য সম্পাদক আর তাহাদের পছন্দের লেখক নামের কুলাঙ্গারমণ্ডলী কতোটা ভয়ংকারভাবে বাংলা ভাষার শুদ্ধতাকে ধর্ষণ করিয়া আমার মায়ের ভাষার বারোটা বাজাইয়া চলিয়াছেন। তাহাদের আস্ফালন দেখিয়া যে কাহারো মনে হইতে পারে, আগের জন্মে তানারা নিশ্চিত ব্যাকরণ পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই আপনি এক ভয়ংকর সত্য আবিস্কার করিতে পারিবেন যে, তানাদের পাণ্ডিত্য বড়োজোড় ওই গুটিকয়েক উপন্যাস পড়িবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রহিয়াছে। সাধু আর চলিত ভাষার পার্থক্য কেমুন, তাহা তানারা ইহ জনমেও বুঝিতে পারেন না। অথচ সাহিত্য সম্পাদনার পাশাপাশি সাহিত্যে তুঘলকির দায়িত্ব তানারা নিজ দায়িত্বে লইয়াছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা দখলের মতো এই গোষ্ঠী বাংলা সাহিত্যকে দখলের প্রচেষ্টায় মাতিয়া রহিয়াছেন। যাহা দিয়া ব্যাকরণের ঐতিহ্য বুঝিবার মতো দাপট অথবা দৌরাত্ম তানাদের ত্রি-সীমানায় থাকিবার কথা নহে। অতএব, সাধু সাবধান। আসুন ভাষার শুদ্ধতাকে যাহারা কবর দেওয়ার প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হইয়াছে ভাষার মাধুর্য মিশাইয়া তাহাদের আমরা একযোগে ভর্ৎসনা করি।

রেজা ঘটক 
বনানী, ঢাকা ॥
১৫ ডিসেম্বর ২০১০।